দ্বিশতবর্ষে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

546
0

১৮৪৮ সাল একটা ছোট্ট খসড়া পুস্তিকা গোটা পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছিল। শুধু সেদিন কেন আজও সেই পুস্তিকা বিশ্বের অন্যতম বহুচর্চিত ও আলোচিত একটি বামপন্থী রাজনৈতিক দর্শন। যে দুই বন্ধুর দ্বারা লিখিত হয়েছিল সেই ইশতেহার তাঁরা হলেন অভিন্ন হৃদয় কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস। তখন গোটা জার্মানি জুড়ে আলোড়ন। গুপ্ত জার্মান সমিতি দায়িত্ব দেয় সমাজতন্ত্রের কাঠামো বা মূল নীতির একটা খসড়া তৈরি করে দিতে। সেই খসড়াটিই সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ হিসেবে। প্রকাশিত হবার সঙ্গে-সঙ্গেই আলোড়ন তোলে গোটা ইউরোপ জুড়ে। মার্কসের সঙ্গে অন্যতম সহযোগী লেখক ছিলেন ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস।

সেদিন সঙ্গী ফ্রিডরিখ না থাকলে মার্কস কি তাঁর চার খণ্ডের ‘ডাস কাপিটাল’ গ্রন্থটি সমাপ্ত করতে পারতেন? সে সময় কপর্দকহীন মার্কস। বন্ধু এঙ্গেলস বাড়িয়ে দিলেন সহযোগিতার হাত। নিয়মিত জোগান দিতে লাগলেন পর্যাপ্ত অর্থ। কিংবদন্তি কার্ল মার্কস ডাস কাপিটাল শেষ করে যেতে না পারলেও তাঁর মৃত্যুর পর এঙ্গেলস বাকি খণ্ডগুলি প্রকাশ করেছিলেন সম্পাদনা করে। আশ্চর্য প্রতিভার মানুষ ছিলেন এই ফ্রিডরিখ। স্কুলের প্রথাগত শিক্ষার পথে না গেলেও বিশ্বের ২০টি ভাষা অনর্গল বলতে পারতেন। মাত্র তিন সপ্তাহে শিখেছিলেন ফার্সি ভাষা। ২৪ বছর বয়সে লিখেছিলেন প্রথম বই ‘দ্য কনডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস’। লিখছিলেন শতাধিক প্রবন্ধ। আধ ডজন বিশ্ববিশ্রুত বই। কথিত আছে তাঁর সময়ে নাকি তিনি ছিলেন সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ।

প্রথম-প্রথম সংবাদপত্রে বিতর্কিত লেখা দিয়ে হাতেখড়ি। যে সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলন স্বয়ং মার্কস। যদিও তাঁদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল অনেক পরে।

এক শিল্পপতি পরিবারে এঙ্গেলসের জন্ম। বাবার ছিল কাপড়কলের ব্যবসা। ১৩ বছর বয়সে এলিমেন্টারি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সেই পড়ায় মন বসল না। ১৭ বছর বয়সে ছেড়ে দিলেন। বাবা চাইলেন ছেলে তাঁর ব্যবসায় প্রবেশ করুক। ব্যবসায় প্রবেশ করলেও সেখানেও তাঁর মন বসল না। একাগ্র চিত্তে অধ্যয়ন করতে শুরু করেন জার্মান দার্শনিক হেগেল-এর বিভিন্ন রচনা। সেই সঙ্গে নিজস্ব লেখালেখি। এই লেখালেখি করতে-করতেই একদিন প্যারিসে দেখা হল মার্কসের সঙ্গে। হয়ে উঠলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধুর পড়াশোনার চর্চা তখন বেড়েই চলে। একদিকে মার্কসের ‘পুঁজিবাদী অর্থনীতির চর্চা’ অনদিকে এঙ্গেলস চর্চা করেছেন বস্তুবাদের ওপর। লেখেন ছোট-ছোট কয়েকটি বই। তারই একটা ‘পরিবার ব্যক্তিমালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ (১৮৯৫), ল্যুদভিগ ‘ফয়েরবাগ’ (১৮৯২), ‘রাশিয়ার প্রসঙ্গে এঙ্গেলস’ (১৮৯৪)। তার অনেক আগে ১৮৭৮ সালে লিখে ফেলেছেন ‘অ্যান্টি ডুয়েরিং’। ভিক্টোরিয়ান দর্শন, অর্থনীতি ও সমাজতন্ত্রের উপর লিখলেন ‘ইংলন্ডের শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা’ নামক বই। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শোষিত শ্রমিকের অবস্থা নিয়ে লেখা এই বইটি আজও সমান জনপ্রিয়।

সমাজবিজ্ঞানী লেখক রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এই ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের আজ জন্মের দ্বিশতবর্ষ। তাঁর জন্মের দুশো বছরে তাঁকে নিয়ে নানা স্তরে চলছে আলোচনা। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৮২০ সালের ২৮ নভেম্বর। ১৮৭০ সালের ৫ অগস্ট তাঁর মৃত্যু হয় ক্যান্সারে। এই দুই বন্ধুর মৃত্যু হলেও দুশো বছর পরেও যেন তাঁরা জীবন্ত তাঁদের দর্শন, ভাবনা ও রচিত গ্রন্থের মধ্য দিয়ে। এখনও দুনিয়ায় অর্থনৈতিক সঙ্কট হলে অর্থনীতিবিদরা ডাস কাপিটালের শরণাপন্ন হন।

 

ভাস্কর ভট্টাচার্য